তেমনি বদলেছে বই পড়ার ধরনও। একসময় মানুষ তালপাতায় বা চামড়ায় লেখা পুঁথি পড়তো, এরপর এলো ছাপাখানার যুগ এবং কাগজের বইয়ের রাজত্ব।
পরবর্তীতে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ই-বুক বা ইলেকট্রনিক বই মানুষের হাতে হাতে পৌঁছায়। আর বর্তমানে, সাহিত্য ও প্রযুক্তির সবচেয়ে যুগান্তকারী সংযোজনগুলোর একটি হলো 'অডিও বুক' (Audiobook) বা শ্রুতিবই। অডিও বুক বলতে সহজ কথায় বোঝায় কোনো বইয়ের রেকর্ড করা কণ্ঠস্বর। অর্থাৎ, বইটি আপনাকে কষ্ট করে পড়তে হবে না; কেউ একজন সুন্দর, স্পষ্ট ও সাবলীল কণ্ঠে বইটি পড়ে আপনাকে শোনাবে। ব্যস্ততম এই আধুনিক জীবনে অডিও বুক যেন পাঠকদের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
### অডিও বুকের ইতিহাস ও বিবর্তন
অডিও বুকের ধারণাটি কিন্তু একেবারে নতুন নয়। ১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে দৃষ্টিহীনদের সহায়তার জন্য প্রথম অডিও বুক তৈরি করা হয়েছিল। তখন মূলত লং-প্লেয়িং (LP) গ্রামোফোন রেকর্ডে বই রেকর্ড করা হতো। এরপর আসে ক্যাসেট টেপের যুগ, যা অডিও বুকের জনপ্রিয়তা বেশ কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। মানুষ গাড়িতে যাতায়াতের সময় বা অবসরে ওয়াকম্যান বা ক্যাসেট প্লেয়ারে বই শুনতো। এরপর আসে সিডি (CD) বা কমপ্যাক্ট ডিস্কের যুগ, যা শব্দ মান আরও উন্নত করে।
তবে অডিও বুকের প্রকৃত বিপ্লব ঘটে ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের যুগে। এখন আর কোনো ফিজিক্যাল ড্রাইভ বা সিডি বহন করার প্রয়োজন নেই। অ্যামাজন অডিবল (Amazon Audible), স্টোরিটেল (Storytel), গুগল প্লে বুকস (Google Play Books)-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কল্যাণে লক্ষ লক্ষ অডিও বুক এখন মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোনের ভেতরেই।
### জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির মূল কারণসমূহ
আধুনিক বিশ্বে অডিও বুকের জনপ্রিয়তা রকেটের গতিতে বাড়ার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে:
* **মাল্টিটাস্কিংয়ের সুবিধা:** আধুনিক মানুষ প্রচণ্ড ব্যস্ত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় শান্ত হয়ে বসে বই পড়ার সময় অনেকেরই নেই। অডিও বুকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি অন্যান্য কাজের পাশাপাশি শোনা যায়। জ্যামে বসে বাসে বা গাড়িতে যাতায়াতের সময়, রান্না করার সময়, জিমে ব্যায়াম করার সময় কিংবা সকালে হাঁটার সময় অডিও বুক শোনা যায়। এটি আমাদের মৃত সময়কে (Dead Time) প্রোডাক্টিভ করে তোলে।
* **চোখের বিশ্রাম:** সারাদিন ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে আমাদের চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে (Digital Eye Strain)। দিন শেষে কাগজের বই বা ই-বুক পড়তে গেলে অনেকেরই চোখ ব্যথা করে বা ক্লান্তি আসে। অডিও বুক এক্ষেত্রে চোখের সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেয়। চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়েও বইয়ের রোমাঞ্চকর জগতে হারিয়ে যাওয়া সম্ভব।
* **জীবন্ত উপস্থাপন ও কণ্ঠস্বর:** আধুনিক অডিও বুকগুলো কেবল একঘেয়ে যান্ত্রিক পাঠ নয়। এখানে প্রফেশনাল ভয়েস আর্টিস্ট বা কণ্ঠশিল্পীরা কাজ করেন। অনেক সময় বইয়ের চরিত্র অনুযায়ী আলাদা আলাদা কণ্ঠস্বর (Voice Modulation) এবং মানানসই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও সাউন্ড ইফেক্ট ব্যবহার করা হয়। এটি শোনার অভিজ্ঞতাকে করে তোলে আরও বেশি জীবন্ত, যা অনেক সময় সিনেমা দেখার চেয়েও রোমাঞ্চকর মনে হয়।
Comments
Post a Comment